পুজোর গন্ধ কি শুধু ত্রিপুরা, অসম, কলকাতার অলিগলিতেই ? নাকি বিভিন্ন পাড়ার মণ্ডপ কিংবা মহালয়ার ভোরে রেডিয়োর সামনে বসেই পাওয়া যায়? উত্তরটা এ বার মিলবে লন্ডনের ইলিংয়েও। সেখানে দুর্গাপুজোর মণ্ডপে দেবীর আরাধনার সঙ্গে জুড়ে যাচ্ছে আকাশবাণীর শতবর্ষের স্মৃতি। ঢাকের বাদ্যি, ধুনুচির ধোঁয়া, চন্দননগরের আলোকসজ্জা আর রেডিয়োর পরিচিত সুর— এ সব কিছু মিলিয়ে বিলেতে বাঙালির পুজোয় এ বার থিম ‘আকাশবাণী’।
বেঙ্গল হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের (বিএইচএফ) ‘লন্ডন শারদ উৎসব’ হতে চলেছে ১৬ অক্টোবর থেকে ১৮ অক্টোবর, গানার্সবারি পার্ক স্পোর্টস হাবে। উৎসব চত্বর ১০ হাজার বর্গফুটের। সেখানে পুজো উপলক্ষে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খাওয়াদাওয়া, আড্ডা এবং শিশুদের জন্য নানা আয়োজনের ব্যবস্থা থাকছে। আয়োজকদের দাবি, এটি ইউরোপের সব চেয়ে বড় দুর্গাপুজো। আকাশবাণী কলকাতার সম্প্রচারের ১০০ বছর পূর্তিকে ঘিরে তৈরি থিম–ই এ বারের আয়োজনের বিশেষ আকর্ষণ।
১৯২৭–এর ২৬ অগস্ট প্রথম সরকারি বাংলা সম্প্রচারের সূত্র ধরে যে যাত্রা শুরু হয়েছিল, তার সঙ্গে বাঙালির পুজোর আবেগ আজও অচ্ছেদ্য। মহালয়ার ভোরে তর্পণের অ্যালার্ম হিসেবে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’ শোনানো শুরু হয়েছিল। সেই ইস্তকই রেডিয়ো, মহালয়া আর দুর্গাপুজো— সব মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। নতুন প্রজন্মের কাছে সেই বার্তাই দিতে চাইছেন বিলেতের এই পুজোর আয়োজকরা। ফলে, নস্ট্যালজিয়া ও ব্রিটেনে বেড়ে ওঠা বাঙালি শিশুদের শিকড়ের সঙ্গে পরিচয়ের সেতু হয়ে উঠছে এই থিম।
পুজোর প্রাণ থাকবে ঠাকুরদালানে। বোধন থেকে দশমী পর্যন্ত যাবতীয় আচার পালন করা হবে সেখানেই। মহাষ্টমীর কুমারী পুজোর পরে উৎসবের সাংস্কৃতিক আবহ আরও জমে উঠবে। চন্দননগরের আলোকসজ্জায় সাজবে গোটা চত্বর। আর থাকবে ঢাকের তালে ধুনুচি নাচ। সব মিলিয়ে, বাঙালির পুজোর সেই চেনা উন্মাদনা বিলেতের মাটিতেও।
ইলিংয়ের পুজোয় আকাশবাণীর স্মৃতিকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে টেনে আনছে ‘রঙ্গমঞ্চ’। ‘বিবিধ ভারতী’-তে থাকছে বাংলা মিউজি়ক্যাল ইভনিং। ‘গীতমালা’-য় ফিরে আসবে মুম্বই ও কলকাতার সঙ্গীত-যোগের স্মৃতি। ছোটদের জন্য ‘ঠাকুমার ঝুলি’—গল্প, অভিনয় ও নতুন প্রজন্মের পরিবেশনা। সঙ্গে থাকছে বিএইচএফ কুইজ়, অন্তাক্ষরী।
মঞ্চে আরও এক টান— লন্ডনে ‘গপ্পো মিরের ঠেক’। জনপ্রিয় বাচিকশিল্পী মিরের সঙ্গে গল্প, রসিকতা আর আড্ডায় পুজোর শেষ দিনের আবহে ঢুকে পড়বে রেডিয়োর সেই চেনা প্রাণচাঞ্চল্য। অর্থাৎ, ‘আকাশবাণী’ শুধু থিমেই সীমাবদ্ধ থাকবে না এই পুজোয়, হয়ে উঠবে গোটা উৎসবের সাংস্কৃতিক স্মৃতির ভিত–ও।
পুজোর সঙ্গে খাওয়াদাওয়ার যোগ অটুট। এ দিকটিও ইলিংয়ে বজায় থাকছে পুরোদস্তুর। ‘বকুলতলা’-য় থাকবে বাংলা ও ভারতীয় স্ট্রিট ফুড এবং মেলার নানা স্টল। ‘মুক্ত অঙ্গন’-এ চপ আর চায়ের সঙ্গে চলবে বাঙালির চিরন্তন আড্ডা। ছোটদের জন্য থাকছে ‘খেলার অঙ্গন’। রোজ দুপুর ১টা ও রাত ৯টায় ভোগ পরিবেশন শুরু হবে এবং চলবে যতক্ষণ না শেষ হচ্ছে, ততক্ষণ। ‘লন্ডন শারদ উৎসব’–এর তরফে কৌশিক চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘আমরা দুর্গাপুজোর জাঁকজমককে লন্ডনের প্রাণকেন্দ্রে নিয়ে এসেছি। সবাইকে এই পুজোয় যোগ দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। বাংলার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ছোঁয়ায় এই পুজো এ বছর অন্য স্তরে পৌঁছতে চলেছে বলে আমাদের বিশ্বাস।’ শেষ দিনে দশমীর পুজোর পরে সিঁদুরখেলা দিয়ে উৎসবের পরিসমাপ্তি।
এ বারের পুজোয় লন্ডনের মাটিতে তিন দিন ধরে তৈরি হবে এক টুকরো বাংলা— যেখানে দেবীর আরাধনা যেমন থাকবে, তেমনই থাকবে গল্প, গান, খাওয়াদাওয়া, আড্ডা আর স্মৃতিচারণা। আকাশবাণীর শতবর্ষকে সামনে রেখে এই পুজো যেন মনে করিয়ে দেবে, দেশ বদলালেও বাঙালির উৎসবের ঠিকানা বদলায় না।


















