সময় ও সত্যের কণ্ঠস্বর

  • হোম
  • বিনোদন
  • উত্তমকুমারের স্ত্রীর মুখের আদলে লক্ষ্মীর মূর্তি, ভোগে নায়কের পছন্দের বেগুন-বাসন্তী, আর কী আয়োজন হয় তাঁর বাড়ির পুজোয়?
Image

উত্তমকুমারের স্ত্রীর মুখের আদলে লক্ষ্মীর মূর্তি, ভোগে নায়কের পছন্দের বেগুন-বাসন্তী, আর কী আয়োজন হয় তাঁর বাড়ির পুজোয়?

গিরিশ মুখার্জি রোডের এই বাড়িতে সাজো সাজো রব। পুজোর তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছে উত্তমকুমারের বাড়িতে। সারা বাড়ি উজ্জ্বল আলোয় সাজানো। তৈরি হয়েছে ফুলের গেট। বাড়ির উঠোনে ঢুকতেই শুরু প্যান্ডেল। লক্ষ্মীর আসনের সামনে আলপনাও সারা। প্রতিমা এসেছে বাড়িতে। এই বাড়ির বিশেষত্ব হল, এই বাড়ির লক্ষ্মীপুজোয় ঢাক বাজে। ঘণ্টার আওয়াজ যেহেতু খুব তীক্ষ্ণ আর লক্ষ্মীর স্বভাব শান্ত, তাই ঘণ্টার বদলে ঢাক বাজানো হয় এই বাড়িতে। পুজোর দিন সকালে এই ঢাকের আওয়াজেই ঘুম ভাঙে পরিবারের সদস্যদের। তার পর থেকে কেউ কেউ ফল কাটতে বসেন, কেউ করেন পুজোর জোগাড়, কেউ কেউ ভোগ রাঁধায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন, আবার কেউ অতিথি আপ্যায়নের প্রস্তুতি নেন।

মূলত বিজয়ার পর থেকেই এই বাড়ির প্রত্যেক সদস্যের কাছে ফোন আসতে থাকে, লক্ষ্মীপুজো হচ্ছে কি না সেই খোঁজখবর নেওয়ার জন্য। এ বারও অনেকেই আসতে চেয়েছেন এই বাড়ির লক্ষ্মীপুজোয়। কারণ এই দিন উত্তমকুমারের বাড়ির দরজা সকলের জন্য খোলা থাকে। যে ঘরে পুজো হয় তার ঠিক বাইরেই বসে উত্তমকুমারের ভাইঝি মৌসুমী দত্ত চট্টোপাধ্যায়। কী ভাবে শুরু হল এই পুজো? জিজ্ঞাসা করতেই তিনি জানান, ‘‘উত্তমকুমারের বাবা সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায়, তিনিই এই পুজো শুরু করেছিলেন। ছেলের নাম বেশি হয়ে গেলে যেমন তাঁর নামেই পুজো বলা হয় তেমন করেই এই পুজো উত্তমকুমারের পুজো নামেই প্রচলিত হয়ে গিয়েছে। আমরা সকলেই এ দেশীয়। তাই কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো আমাদের হত না। উত্তমকুমারের বাবা এক দিন স্বপ্ন দেখেছিলেন যে আমাদের বাড়ির যে সিঁড়ি, তখন সেটা কাঠের সিঁড়ি ছিল,’’ বলেই উল্টোদিকের সিঁড়িটা দেখান তিনি।

তিনি বলে চলেন, ‘‘এই সিঁড়ি দিয়ে তিনটি বাচ্চা মেয়ে উপরে উঠছে— এমনটাই স্বপ্নে দেখেছিলেন আমার ঠাকুরদা। তিনি তাঁদের কোথায় যাচ্ছ জিজ্ঞাসা করায় এক জন উত্তর দেন উপরে তো ঠাকুরঘর, সেখানেই যাচ্ছি। তাঁদের নাম জানতে চাইলে তাঁরা নাম বলেন, এক জনের নাম সরস্বতী, অন্য জন লক্ষ্মী আর এক জনের নাম বলেন অন্নপূর্ণা।’’ বলতে বলতেই তিনি খানিক শিহরিত হন। হাত দেখিয়ে বলে ওঠেন ‘‘আমার গায়ে এখনও কাঁটা দিচ্ছে। ‘ঠাকুরদা এর আগে কালীপুজোর দিন লক্ষ্মীপুজো করতেন, যেটাকে অলক্ষ্মী বিদায় বলা হয়। কিন্তু সেটা বন্ধ করে কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো করা শুরু করেন সেই থেকেই। এখনও যা চলছে।’

উত্তমকুমার থাকাকালীন পুজোর দিনে পুরো উঠোন ভরে যেত। এখনও তা ভরে যায় তবে আগে তিলধারণের জায়গা থাকত না। তিনি বলেন, ‘‘উত্তমকুমার একটি আরাম কেদারায় বসে থাকতেন সারাদিন। পুজোর সময় নিজেই পুজোয় বসতেন। বিভিন্ন মানুষ এসে গুরু গুরু বলে চিৎকার করতেন। কখনও কখনও তিনি আবার নিজেও ঘুরে তাকাতেন। আর বাড়ি জুড়ে শুধু গুরু গুরু ধ্বনী উঠত।’’

উত্তমকুমারের নাতনি নবমিতা চট্টোপাধ্যায় ছোট থেকেই এই পুজোর সঙ্গে জড়িয়ে। বাড়ির উঠোনে তিনি আলপনা দেন। এ বারেও তিনি মূর্তির সামনে বসে আলপনার তোড়জোড় করেছিলেন। তুলিতে রং বোলাতে বোলাতে তিনি বলেন,‘‘এই বাড়ির সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হল মূর্তি। মা লক্ষ্মীর মুখ অবিকল উত্তমকুমারের স্ত্রী গৌরী দেবীর আদলে তৈরি হয়। শিল্পী নিরঞ্জন পাল প্রথম এই প্রতিমা তৈরি করেছিলেন। উত্তমকুমার এবং তাঁর বাবার সঙ্গে কথা বলতে এই বাড়িতেই এসেছিলেন শিল্পী। সেইসময় গৌরীদেবীও এক বার এসেছিলেন সেই ঘরে, চা করবেন বলে কত জন আছেন তা দেখতে। শিল্পী সেই এক ঝলক দেখেই মনে গেঁথে রেখেছিলেন সেই মুখ। আর অবিকল একইরকম দেখতে প্রতিমা গড়েছিলেন তিনি। বাড়ির কেউই তা জানতেন না। বাড়িতে মূর্তি আসতেই তা দেখে অবাক হয়ে যান সকলে। আজও ওই একইরকম মূর্তিতে পুজো হয়। শিল্পীর কাছে ছাঁচ বানানো রয়েছে, যা দিয়ে প্রতি বছর একইরকম মূর্তি তৈরি করেন। যা দেখে মনে হয় একজন মানুষ বসে রয়েছে।

উত্তমকুমারের বাড়িতে ইন্ডাস্ট্রির অনেকেরই আসা যাওয়া লেগে থাকত। তাঁরাও এই পুজোয় শামিল হতেন। হইহই চলত চট্টোপাধ্যায় পরিবারে। দুর্গাপুজো থেকেও লক্ষ্মীপুজোই ছিল তাঁদের সবচেয়ে প্রিয় উৎসব। আজও একই ভাবে রাখা উত্তমকুমারের সেই আরামকেদারা। জগন্নাথের ছবির নীচেই মহানায়কের ছবি আর তার ঠিক নীচেই মা লক্ষ্মীর মূর্তি। নবমিতা এ বার নস্টালজিক, তিনি বলেন, ‘‘বাবার কাছে গল্প শুনেছি আগে বাড়িতে ভিয়েন বসত। পান্তুয়া তৈরি হত, দরবেশ পাকানো হত। লুচি হত, সঙ্গে ছোলার ডাল, ফুলকপির তরকারি, ধোঁকার ডালনা, ছানার ডালনাও হত। দাদুর প্রিয় ছিল বেগুন বাসন্তী, সেটাও হত। এখন মানুষ রিচ খাবার খেতে চায় না তাই কিছু বদল এসেছে। এখন তাই পনীর, ভেজিটেবল চপ, মিক্সড ভেজ হয়। আগের বছর যেমন পোলাও করা হয়েছিল। মিষ্টিটাও যেমন মাঝেমধ্যে পান্তুয়া, আবার কখনও কমলাভোগ হয় এখন।’’

এখন পুজোর দিনে বাড়িতে ভোগে তৈরি হয় ঘিয়ের লুচি, আলুর দম, পোলাও, ফুলকপি বা বাঁধাকপির তরকারি, পাঁচ রকম ভাজা, লাল শাক ভাজা, চাটনি আর পায়েস। সঙ্গে থাকে মিষ্টি। বাড়ির সকলে মিলেই সব কাজ করেন। আলপনা দেওয়া থেকে ঠাকুর আনা, পুজো করা, ভোগ রান্না করা, ঠাকুর বিসর্জন দেওয়া পর্যন্ত সব কাজই করেন। সবশেষে নবমিতা বলেন, ‘‘আমাদের মা লক্ষ্মী খুবই জাগ্রত। এই দু’দিন প্রস্তুতি আর পুজো মিলিয়েই কেটে যায় আমাদের। সকাল থেকে উঠে তোড়জোড়, দেবলীনা গঙ্গায় ডুব দিয়ে ঘট নিয়ে আসে, ও আর আমার বোন মৌমিতা চট্টোপাধ্যায় ঠাকুর সাজায়। গৌরব পুজো করে। হু হু করে সময় কেটে যায়। মায়ের যখন বিসর্জন হয় মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। মায়ের চোখের দিকে তাকালে মনে হয় চোখে জল। ফের আবার পরের বছরের অপেক্ষা করি আমরা।’’

Related Posts

Scroll to Top